ডাকসু ও জাকসু নির্বাচনে চরম ভরাডুবির পর ছাত্রদলের সাংগঠনিক কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আসছে। ভোটের মাঠে অস্তিত্ব সংকটে পড়া এবং অভ্যন্তরীণ সমন্বয়হীনতাসহ নানা কারণে সংগঠনটিতে নতুন নেতৃত্ব আনতে চায় বিএনপি। এরই অংশ হিসেবে বর্তমান কমিটি ভেঙে দ্রুতই সংগঠনের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি করার কথা শোনা যাচ্ছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনায় সহসাই নতুন কমিটি হতে পারে এমন আভাস পাওয়া গেছে।
জানা গেছে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার সময় ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা গত বছরের ৫ আগস্টের পর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যাওয়ার সুযোগ পায়। অনেকটা নির্বিঘ্নে সংগঠন গোছানোরও পথ তৈরি হয়। কিন্তু এক বছরের মাথায় এসে সেভাবে সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত করতে না পারা, ছাত্রদল নেতাদের সঙ্গে বিএনপির দায়িত্বশীলদের সমন্বয় এবং সহযোগিতার ঘাটতি, ছাত্র সংসদ নির্বাচনে প্রস্তুতির ঘাটতির কারণে ছাত্রদলের তৎপরতা মুখ থুবড়ে পড়েছে। যা নিয়ে খোদ সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যেও ক্ষোভ আছে। এমন পরিস্থিতিতে কমিটি ভেঙে দিয়ে একটি নতুন নেতৃত্ব গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপির হাইকমান্ড।
২০২৪ সালের ১ মার্চ রাকিবুল ইসলাম রাকিবকে সভাপতি ও নাসির উদ্দীন নাসিরকে সাধারণ সম্পাদক করে ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়। ওই বছরের ১৫ জুন ছাত্রদলের ২৬০ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটি অনুমোদন করা হয়।
দীর্ঘদিন পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় গত ৯ সেপ্টেম্বর। আর ৩৩ বছর অনুষ্ঠিত হয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু) নির্বাচন। দুই ক্যাম্পাসের আলোচিত এই নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় পেয়েছে ছাত্রশিবির। বিপরীতে ছাত্রদলের হয়েছে চরম ভরাডুবি। কেন্দ্রীয় সংসদ থেকে শুরু করে হল কমিটি কোথাও পাত্তা পায়নি ছাত্রদলের প্রার্থীরা।
জাকসুতে ভোটের শেষদিকে ভোটগ্রহণে অনিয়ম, প্রশাসনের পক্ষপাত এবং একটি মহলের প্রত্যক্ষ সহায়তায় নির্বাচনী প্রক্রিয়া প্রভাবিত হয়েছে এমন অভিযোগ তুলে ভোট বর্জন করে ছাত্রদল। আর ডাকসুতেও এমন ছোটখাটো কিছু অভিযোগ তুললেও ভোট বর্জন করেনি সংগঠনটির প্রার্থীরা। এরমধ্যেও বড় পদের পাশাপাশি হল সংসদের কিছু পদে ছাত্রদলের প্রার্থীরা বিজয়ী হতে পারেন এমন প্রত্যাশা থাকলেও ফলাফল দেখে চরম হতাশ হয়েছেন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা।
বিএনপি নেতা ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের ভাষ্য, ছাত্রদল ডাকসু নির্বাচনে অংশ নেবে কি না শুরু থেকেই এ নিয়ে একধরনের দ্বিধা ছিল। প্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠনগুলো যখন ক্যাম্পাসে নানাভাবে তৎপরতা চালিয়েছে তখন ছাত্রদল প্যানেলও ঘোষণা করতে পারেনি। ভোটের মাত্র ২০ দিন আগে প্যানেল ঘোষণা করে ছাত্রদল।
এছাড়াও পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না থাকা, সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাব এবং প্রচারণা কৌশল কী হবে, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রেও ছাত্রদলের মধ্যে সঠিক সমন্বয় ছিল না।
ভরাডুবিতে চাপে আছেন দায়িত্বশীল নেতারাও
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ডাকসুর পর জাকসুতেও ছাত্রদলের চরম ভরাডুবি বিএনপিকে ভাবিয়ে তুলছে। বিশেষ করে ডাকসু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রথমে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উপদেষ্টা ড. মাহাদী আমিন ও বিএনপির ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক রকিবুল ইসলাম বকুল দায়িত্বে ছিলেন। পরবর্তীতে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী ও প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হন।
অভিযোগ আছে, ছাত্রদলের প্যানেলের শীর্ষ তিন পদের প্রার্থীদের নিয়ে সংগঠনের কেন্দ্রীয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে পছন্দ-অপছন্দের বিষয় ছিল। বিএনপির দায়িত্বশীলদের মধ্যেও এ নিয়ে টানাপোড়েন ছিল। যার প্রভাব পড়েছে নির্বাচন পূর্ববর্তী সার্বিক কার্যক্রমে। এমন কি নির্বাচনী তহবিল যথাযথ বণ্টন হয়নি এমন অভিযোগও আছে। অবশ্য এ নিয়ে কেউ প্রকাশ্যে মুখ খুলছেন না।
শোনা যাচ্ছে শিবির নাকি ১৫ কোটি টাকা খরচ করেছে। সেখানে ছাত্রদলের কত খরচ করেছে কেউ জানে? দলের পক্ষ থেকে নিশ্চয়ই ভালো বরাদ্দ হয়েছে। নেতাকর্মীদের সক্রিয় রাখার জন্যও তো খরচ করা দরকার ছিল। হাইকমান্ডের খতিয়ে দেখা উচিত নির্বাচনী ফান্ড কোথায় খরচ হয়েছে।
— নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ছাত্রদলের এক সহ-সভাপতি
বিশেষ করে ডাকসুতে ছাত্রদলের ভিপি প্রার্থী আবিদুল ইসলাম খান আবিদ বেশ আলোচিত হলেও দল এবং সংগঠনের পক্ষ থেকে সহযোগিতা পেলে ভালো করার সম্ভাবনা ছিল বলে দাবি করছেন খোদ সংগঠনের নেতারা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ছাত্রদলের একজন সহ-সভাপতি ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘শোনা যাচ্ছে শিবির নাকি ১৫ কোটি টাকা খরচ করেছে। সেখানে ছাত্রদলের কত খরচ করেছে কেউ জানে? দলের পক্ষ থেকে নিশ্চয়ই ভালো বরাদ্দ হয়েছে। নেতাকর্মীদের সক্রিয় রাখার জন্যও তো খরচ করা দরকার ছিল। হাইকমান্ডের খতিয়ে দেখা উচিত নির্বাচনী ফান্ড কোথায় খরচ হয়েছে।’
তারেক রহমানের হস্তক্ষেপে আসছে বড় রদবদল
ছাত্রদলের চলমান সাংগঠনিক স্থবিরতা ও নির্বাচনী ব্যর্থতায় ক্ষুব্ধ বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দলীয় সূত্র জানায়, তিনি ইতোমধ্যেই ছাত্রদলের বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটি ভেঙে দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন এবং খুব শিগগিরই আংশিক আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা হতে পারে এমনটা জানা গেছে।
- ছাত্র সংসদ নির্বাচনের পর ছাত্রদলের বিষয় নিয়ে দলে জোরালো আলোচনা হয়েছে। কমিটি ভেঙে দেওয়ার বিষয়েও কথা এসেছে। হয়তো দ্রুতই পরিষ্কার হবে।
— নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির একজন যুগ্ম মহাসচিব - এক্ষেত্রে তরুণ নেতৃত্বের বিকাশ, ছাত্র রাজনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তার পরিকল্পনা অনুযায়ী ভবিষ্যতের ছাত্রদল হবে ত্যাগী কর্মীভিত্তিক, সাংগঠনিকভাবে গতিশীল এবং দলের ঘোষিত ৩১ দফা রাষ্ট্র সংস্কার রূপরেখা বাস্তবায়নে সক্রিয় অংশীদার।
নতুন কমিটি করার ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয়কে গুরুত্ব দিতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
বিশেষ করে মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয়তা, বিতর্কমুক্ত ব্যাকগ্রাউন্ড, শিক্ষার্থীবান্ধব ভাবমূর্তি ও গ্রহণযোগ্যদের নেতৃত্বে আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
অবশ্য ছাত্রদলের কমিটি ভেঙে নতুন নেতৃত্বে আনার বিষয়টি নিয়ে ড. মাহাদী আমিন, বিএনপির ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক রকিবুল ইসলাম বকুল, শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানীর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হয়। তবে কারও সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
তবে বিএনপির একজন যুগ্ম মহাসচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ছাত্র সংসদ নির্বাচনের পর ছাত্রদলের বিষয় নিয়ে দলে জোরালো আলোচনা হয়েছে। কমিটি ভেঙে দেওয়ার বিষয়েও কথা এসেছে। হয়তো দ্রুতই পরিষ্কার হবে।’
কেন্দ্রে কারা আসতে পারে নতুন নেতৃত্বে?
সূত্র জানিয়েছে, এবার ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদে ২০১০-১১ সেশন থেকে ২০১২-১৩ সেশনের (ঢাবি) নেতারা কমিটির জন্য বিবেচিত হতে পারে। এ হিসেবে কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফারহান মো. আরিফুর রহমান আলোচনায় রয়েছেন। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সহ-সভাপতি আনিসুর রহমান খন্দকার অনিক, কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাসুম বিল্লাহ ও তারিকুল ইসলাম তারেক আলোচনায় রয়েছেন।
যদি ২০০৯-১০ সেশন থেকে যদি কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নির্বাচিত করা হয়, তাহলে বর্তমান কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক আমানউল্লাহ আমান এবং ১নং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মমিনুল ইসলাম জিসানকে বিবেচনা করা হতে পারে। কারণ তাদের দুইজনেরই বেশ পরিচিতি আছে। তবে ৯-১০ সেশন থেকে নেতা না আসার সম্ভাবনাই বেশি।
তাছাড়া ২০১১-১২ সেশন থেকে আলোচনায় রয়েছেন ইব্রাহিম খলিল, দ্বীন ইসলাম খান, মো. নাছির উদ্দিন শাওন, তারেক হাসান মামুন, গাজী সাদ্দাম হোসেন, মিনহাজ আহমেদ প্রিন্স, রাজু আহমেদ, সাইদুর রহমান, হাসান আবিদুর রেজা বায়েজিদ, শামিম আকতার শুভ, আব্দুল্লাহ আর রিয়াদ প্রমুখ।
২০১২-১৩ সেশন থেকে আলোচনায় রয়েছেন সাংগঠনিক সম্পাদক নূরে আলম ভূঁইয়া ইমন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটিতে আসতে পারেন যারা
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির এক নম্বর ইউনিট হচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা। সময় ও পরিস্থিতি বিবেচনায় ডাকসুর প্যানেলে থেকে ভিপি পদে নির্বাচন করা ২০১৫-১৬ সেশনের আবিদুল ইসলাম খান সবচেয়ে বেশি আলচনায়।
এ শাখায় ২০১৩-১৪ সেশন থেকে শুরু করে ২০১৫-১৬ সেশনের নেতাদের মধ্য থেকে নেতৃত্বে আসতে পারে বলে জানা গেছে। ২০১৩-১৪ সেশন থেকে ঢাবি শাখা ছাত্রদলে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইমাম আল নাসের মিশুক, আল আমিন ও জসিম খান আলোচনায় রয়েছেন।
এছাড়া ২০১৪-১৫ সেশন থেকে আলোচনায় রয়েছেন ঢাবি শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বিএম কাওসার। এছাড়া ফেরদৌস আলম, সাইফ খান, আলমগীর হোসেন, আকিব জাবেদ রাফি সাইফ খান, মিনহাজুল ইসলাম নয়ন, বজলুর রহমান বিজয়, নুরুল আমিন নুর এবং আখতারুজ্জামান বাপ্পিও আলোচনায় রয়েছেন।
এর বাইরে, ডাকসুতে মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন বিষয়ক সম্পাদক পদে আরিফুল ইসলাম, জিএস পদে হামিম বারী, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক পদে মো. মেহেদী হাসান এবং সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক পদে নির্বাচন করা আবু হায়াত মো. জুলফিকার জিসানকে ঢাবি শাখার নেতৃত্বের জন্য বিবেচনা করা হতে পারে বলে জানা গেছে। এছাড়া রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আয়াজ মোহাম্মদ ইমনের নামও।
