উর্দূ-ফারসি চর্চা করার ভিতরে নিঃসন্দেহে ফায়দা রয়েছে। এই ভাষায় অনেক আকাবীর ওলামায়ে কেরামের হিকমতপূর্ণ বাণী পাওয়া যায়। আর বিশেষত কিছু কবিতার মধ্যে বিশেষ হিকমতও রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এইগুলো শেখার মূল মাকসাদ কী? নিঃসন্দেহে উদ্দেশ্য একটাই: কুরআনুল কারীম ও হাদিস শরীফের মর্মার্থ গভীরভাবে অনুধাবন করা।
এখন প্রশ্ন হলো, কুরআন হাদিসের ব্যাখ্যায় সবচেয়ে সব সমৃদ্ধ, প্রামাণ্যও বিস্তৃত গ্রন্থসমূহ চমৎকার গ্রন্থগুলো কি আরবিতে যথেষ্ট পরিমাণে নেই? আরবি ভাষায় জ্ঞানের যে বিশাল ভান্ডার রয়েছে, তা শতাব্দির পর শতাব্দি মুত্বা’লাআ করলেও শেষ করা সম্ভব নয়। তথাপি আত্মার প্রশান্তির জন্যও আরবি ভাষাই যথেষ্ট। তবে উর্দূ ভাষায় দক্ষতা অর্জনেরও কিছু প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বটে। কারণ আমাদের উপমহাদেশে যাদের মাধ্যমে দ্বীন পেয়েছি, তাদের মত ও চিন্তা এ ভাষাতেই বিদ্যমান। এখানে দ্বীমত পোষণের কোন অবকাশ নেই। কিন্তু উর্দু ভাষাকেই জ্ঞান চর্চার একমাত্র বা প্রধান উৎস বানানোটা অবশ্যই বেমানান । উর্দূ অতিরিক্ত চর্চার কারণে অনেক জ্ঞানপিপাসু তালিবুল ইলম আরবি ভাষার মাধুর্যতা থেকে বঞ্চিত হয়।
আরও আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, কেউ কেউ উর্দু কবি–সাহিত্যিকদের কবিতা ও বাণীকেই অধ্যয়নের কেন্দ্র বানিয়ে নিচ্ছে এবং সেগুলোকে ওয়াজ–নসিহতের প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে। অনেক সময় এগুলো এমনভাবে দলিল হিসেবে পেশ করা হয়, যেন সেগুলো অকাট্য শরঈ নস।
আমি দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে চাই, যারা আরবি অধ্যয়ন না করে বা অল্প পড়ে উর্দু সাহিত্যকেই কুরআন–হাদিস বোঝার ভিত্তি বানিয়েছে, তারা প্রকৃত অর্থে দ্বীনের গভীরে প্রবেশ করতে পারেনি। আরবি ছাড়া ইসলাম, কুরআন ও হাদিস বোঝার কোনো বিকল্প পথ নেই।
এবার আমার একটা অভিজ্ঞতা শেয়ার করি। আমি একবার বাংলাদেশের বিখ্যাত একটি মাদ্রাসার মসজিদে অধীর আগ্রহে জুমআর খুতবা শুনলাম। খতিব সাহেব তাঁর প্রায় ঘন্টাব্যাপী বক্তৃতার গোটা সময়টাতেই হযরত ইউসূফ (আ) এর ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে শুধু জালালুদ্দিন রুমির (রহ.) একটা কবিতা অনুবাদ করে তার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে খুতবা শেষ করে দিলেন। আর মাঝে মাঝে কবি কি বলেছেন এটার সাথে আল্লাহর কথাও মিলে যায়, এমন কিছু কিছু আয়াত পাঠ করলেন। মনে হলো যেন কবিতাটাই ছিল মূল, আর আয়াত তার অনুগামী। অথচ কুরআন ও হাদিসে এ সম্পর্কে বিস্তারিত অনেক নস রয়েছে,যা থেকে নসীহা নেওয়ার মত অনেক বিষয় রয়েছে।
এখন যদি বলেন কবিতার ভিতরেও তো হিকমত রয়েছে। আমার প্রশ্ন হলো, এই হিকমত কি রাসুল (স) মুখনিঃসৃত বাণী থেকেও বেশি?
এবার আরেকটি সংকটের কথা বলি, উর্দু ফারসি ভাষার এই অতিরিক্ত চর্চার কারণে সাধারণ বাঙালি ও জেনারেল শিক্ষিত মানুষ শতাব্দির পর শতাব্দি ধরে কুরআন হাদিসের স্বাদ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। যেখানে ওলামায়ে কেরামই তৃতীয় আরেকটি ভাষার মধ্যস্ততায় কুরআন হাদিসের অনুবাদ বুঝতেন, সেখানে যারা তৃতীয় ভাষায় অজ্ঞ তারা কুরআন হাদিস থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হয়েছেন যুগের পর যুগ। তাহলে ওলামায়ে কেরামের উপরে বর্তিত দায়িত্ব থেকে তারা কি নিস্কৃতি পেয়েছেন? তারা যদি স্বজাতিকে মাতৃভাষায় দ্বীন প্রচার করতে ব্যর্থ হন তাহলে তাদের উপর যে দাওয়াতের জিম্মাদারি ছিল তা থেকে তারা কিভাবে মুক্ত হবেন? তাই বলতে চাই, ওলামায়ে কেরামের এখন আরবি ভাষা শেখার সাথে সাথে বাংলা সাহিত্যেও সমান পারদর্শি হতে হবে।
এ জাতি মুসলিম সাহিত্যিকদের থেকে বহুযুগ বঞ্চিত থাকার দরুন বিধর্মী সাহিত্যের প্রভাবে অনেক বদ আকিদা তাদের হৃদয়ে বিদ্ধ হয়ে গিয়েছে। তাই সাংস্কৃতিক এই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হলে ওলামায়ে কেরামকে উর্দু নয় বরং বাংলা সাহিত্যে এবং বাংলা ভাষাতেই ইসলাম চর্চা করতে হবে। কারণ আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক জাতির কাছে তাদের মাতৃভাষাতেই নবী প্রেরণ করেছিলেন। মহান রব্বুল আলামীন পবিত্র কুরআনুল কারীমে ইরশাদ করেন:
“আমি প্রত্যেক রসূলকে তার স্বজাতির ভাষাভাষী করে পাঠিয়েছি, যাতেসে তাদের কাছে (আল্লাহর বার্তা) বুঝিয়ে বলতে পারে।” (সূরা ইবরাহিম, ১৪:০৪)
মোঃ রহমাতুল্লাহ, শিক্ষার্থী (শরহে বেকায়া), মাদরাসাতুল আবরার, কামরাঙ্গীরচর,
